আজ একুশ ফেব্রুয়ারি। অফিস ছুটি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে অফিস ছুটি। এই বাসাতে মা আর মেয়ে থাকে। মেয়েটি সকালে বেরিয়েছে এখন পর্যন্ত আসেনি। চিন্তিত মা; মেয়ে ছাড়া কেউ নেই তাঁর। মেয়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে; দিনকাল ভালো নয়! কোথা দিয়ে কী হয়ে যায় বলা মুশকিল। মেয়েকে বলা যায় না কিছু; বললেই অভিমান। তাছাড়া কিছু বলতেও পারে না তমালিকা। বাপমরা মেয়ে!
ঘড়ি দেখে তমালিকা। ঘন্টার কাঁটা ছয়টার ঘর ছুঁইঁছুই করছে। যাওয়ার সময় পইপই করে বলেছে তাড়াতাড়ি ফিরতে কিন্তু কে শোনে কার কথা! ঐ মেয়ে কী বুঝবে মায়ের বুকের ব্যথা; সন্তান ভাবে সবই মায়ের মুখের কথা; সব সন্তানের মতো ওর মেয়েও একই কথা ভাবে। কিন্তু মায়েরা যে সন্তানের জন্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তা কী সন্তানেরা বুঝে নাকি বুঝতে পারে! মেয়েটা না থাকলে ওর এই একলা জীবন নিয়ে করবে কী? মেয়ে ছাড়া কেউ নেই ওর। কেউ না। মেয়ের বাবা যখন তাঁর জীবনের গাঁটছড়া খুলে নিজ-বাড়িতে অর্থাৎ যেখান থেকে এসেছিল সেখানে চলে গেল তখন চোখে অন্ধকার দেখেছিল। শ্বশুরবাড়ির অবহেলা, অনাদর, অপমান সহ্য করে ডিগ্রিটা নিয়েছিল; এই ডিগ্রিটা চাকুরির জন্য খুবই দরকার ছিল, আর চাকরি দরকার ছিল মেয়েটির জন্য; শুধু কী মেয়ের জন্য? তা নয় নিজের জন্যও তো কি ছিল না; ছিল। ডিগ্রি পেলেও চাকুরি পায়নি সহজে, অনেক ঘুরে অনেক ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি পেয়েছিল; আর চাকুরি পেয়েছিল বলেই মেয়েকে লেখা- পড়া করাতে পারছে, নিজে খেতেপরতে পাচ্ছে, মেয়েকেও খেতেপরতে দিতে পাচ্ছে।
মসজিদে মাগরিবের আজান শোনা যাচ্ছে। নড়েচড়ে বসে তমালিকা! মেয়েকে কিছু না বললেই চলছে না! এতোবার বলা সত্ত্বেও দেরি করছে। যদি কোন অঘটন ঘটে। মায়ের মন বাঁধ দিতে পারছে না; কুচিন্তাগুলো সুড়সুড় করে ঢুকে যাচ্ছে মনের মধ্যে; আজকালকার ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের মন বুঝতে চায় না। অনেকগুলো দিন পার হয়ে গেছে শুধু মেয়েকে নিয়ে; মেয়েকে নিয়ে ভয় দিনদিন বাড়ছে; এই মূল্যবোধহীন অবক্ষয়িত সমাজের সিড়ি বেয়ে আরাধ্য স্থানে পৌঁছতে পারবে তো মেয়ে? কিছুই জানে না তমালিকা । ও বিশ্বাস করে নিয়তির কাছে অসহায় মানুষ; তমালিকা নিজেও তাই। প্রতিনিয়ত হতাশা গ্রাস করে ওকে ।
সব দিক থেকে ঘিরে থাকে হতাশা। এই সেদিন পুড়লো চুড়িহাট্টা; আগুন লাগলো বস্তিতে। সারাক্ষণ লেগে আছে বাসের প্রতিযোগিতা; প্রাণ হারাছে মানুষ। দূষণ বাড়ছে; নদী, বায়ু, শব্দ সব নিয়েই বিপর্যস্ত, বিপন্ন-বিষণ্ন মানুষ। এরমধ্যে আবিষ্কার হচ্ছে নিত্য নতুন ভাইরাস। মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর-ক্লান্ত মানুষ! এমন সময় কাকের ডাকে চমকে ওঠে তমালিকা। কী কথা জানাতে চায় কাক! বুঝতে পারবে না জানে তবুও বুঝতে চাইছে; কাকের কা-কা- রবে মওলানা রুমির একটি গল্পের কথা মনে পড়ে গেল তমালিকার।
“তখন নবী মূসা (আ.) এর আমল। একজন ধনী যুবক পশুপাখির ভাষা বুঝতে নবীজির কাছে এসেছেন; নবীজি শেখাতে চাইছেন না; তিনি শিখবেন। তিনি নবীজিকে বললেন, “আর কিছু না হোক কুকুর ও পাখির ভাষা শিখিয়ে দিন।” তিনি শিখলেন-জানলেন-বুঝলেন! এরপর মুরগী আর কুকুরের কথোপকথনে ঘোড়া, গাধা, দাস-ওদের মৃত্যুকথা জানতে পেরে সেগুলো বিক্রি করে দিলেন। এরপর যখন জানতে পারলেন নিজের মৃত্যুকথা তখন দৌড়ে গেলেন নবীজির কাছে; ফিরিয়ে নিতে বললেন তার মৃত্যুসাজা। কিন্তু নবীজি বললেন, ‘তা সম্ভব নয়! কারণ কেউ তার পরিণতি এড়াতে পারে না।’-” কেন এই গল্পের কথা মনে এলো? কী বলে গেল কাকটি? আছে কোথায় মেয়ে? কোথায় তাঁর মেয়ে? ভাবছে তমালিকা। কিছু সময় পরে ডোরবেল বেজে উঠলো। তমালিকা উঠে দাঁড়ায়; এলো বুঝি মেয়ে!
#afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি
