সকাল থেকেই বাঁ চোখের পাতাটা লাফাচ্ছে। বুকের ভেতর মাঝেমধ্যেই শূন্য হয়ে যাচ্ছে নীতার। খা, খা কোথা থেকে উড়ে এসে রান্না ঘরের বারান্দার গ্রিলে বসে ডাকতে শুরু করলো একটা কাক। নীতার মন খুব খারাপ হয়ে গেলো। ভারাক্রান্ত মন নিয়েই সকালের কাজগুলো করছিলো, কিন্তু এখন আর কাজে মন দিতে পারছে না। শুধুই মনে হচ্ছে কী জানি কী হয়! কোন অমঙ্গল, কোন অঘটন অপেক্ষা করছে ওর জন্য কে জানে!
নীতা, কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না। তবুও মাঝেমধ্যে কুসংস্কারে বিশ্বাস হয়েই যায়। সেই ছোটবেলা- বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই লক্ষ্য করেছে, বাঁ চোখের পাতা কাঁপলে আর বুকের ভেতর শূন্য হয়ে গেলে ওকে কাঁদতে হয়। ছোট-খাটো এমন কিছু ঘটনা ঘটে, ও কাঁদতে বাধ্য হয়! কিন্তু এর সঙ্গে যদি কাক ওই রকম বিশ্রী সুরে ডাকে তা হলে বড়ো কিছু অঘটন ঘটে! পাখিদের ভাষা বুঝি না আমরা, তবুও কিছু একটা জানান অবশ্যই দেয়। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। পশু, পাখি, মানুষ সবারই ভাষা আছে।
ওর দাদি বলতো বাঁ চোখের পাতা কাঁপলে কাঁদতে হয়, দাদিও না কি কেঁদেছে ! ওর দাদা মারা যাওয়ার দিন সকাল বেলা ওর দাদির নাকি বাঁ চোখের পাতা কেঁপেছিল, শূন্য হয়ে গিয়েছিল বুকের ভেতর, আর একটা কাক খা,খা করে বিশ্রী গা ছমছম করা সুরে ডেকেছিল। ভালো মানুষ দাদা নাকি সকালে হাটে গিয়ে, ফিরে এসেছিল সন্ধ্যায় লাশ হয়ে। নীতার বাবা তখন খুব ছোট। দাদি প্রায়ই এই কথা বলতো। দাদির কাছে শুনতে শুনতে বাঁ চোখের পাতা কাঁপলে, আর কাক ডাকলে অঘটন ঘটার অজানা ভয়ে বুক কাঁপতে থাকে ওর।
কাকটা বারান্দার গ্রিলে বসে একটানা ডেকেই চলেছে। নীতা, কাকটাকে হাতের চামচটা দিয়ে হুস হুস করে তাড়িয়ে দেয়। কাকটা চলে গিয়েও ফের উড়ে আসে। বসে গ্রিলে। বোবা চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। এবার রুটি ছিড়ে ছড়িয়ে দেয়। উড়ে যায় কাক। কাক চলে গেলেও মন ভালো হয় না ওর। মনের মাঝে কী এক আশংকায় জল ঝরতে থাকে। কন্ঠের কাছে দলা বেধে থাকে কষ্ট। কিছুতেই কিছু ভালো লাগে না।
নীতা, একটা কলেজে আছে। বি.সি.এস. দিয়েছিল। ব্যাংকে চাকরিও হয়েছিল ওর। কিন্তু ও শিক্ষকতাকেই বেছে নিয়েছে। কারণ মেয়েদের জন্য শিক্ষকতা সম্মানজনক চাকরি। তা ছাড়া ওর পড়াতে ভালো লাগে, পড়াশুনার মধ্যে ডুবেও থাকা যায়। আবার ছেলে-মেয়ে-ঘর-সংসার ঠিক রাখাও যায়।
আমাদের এই সমাজে অবশ্য নারীদের ক্যারিয়ার বলে কিছু নেই। সব ক্যারিয়ার সংসার আর স্বামী,সন্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে নীতা তার ক্যারিয়ার ধরে রেখেছে। নীতা, তার ক্যারিয়ার ধরে রাখতে পারতো না, যদি তার স্বামী সব সময় তাকে সাহায্য না করতো। শিক্ষকতায় ওর নাম ছড়িয়ে পরার পেছনেও আছে ওর স্বামী।
ওদের কলেজে ভালো টিচার হিসেবে নাম আছে ওর। ওরা কয়েকজন টিচার মিলে কলেজটাকে দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। এবার ৯০ জন ছাত্রের মধ্যে দুই জন ছাড়া সকলেই জি.পি.এ. ৫ পেয়েছে, গোল্ডেন জি.পি.এ. পেয়েছে ৫ জন। কলেজটা ভালো হচ্ছে, ভালো চলছে কিন্তু দুঃসংবাদ হয়ে দেখা দিয়েছে অনুদান বন্ধের খবর। অনুদান বন্ধ হওয়াতে বেতন বাড়ানো হয়েছে ছাত্রদের, বাড়ানো হয়েছে পরীক্ষার ফিসহ আনুষাঙ্গিক খরচ । তারপর শুরু হয়েছে হৈ চৈ। মিটিং, মিছিল, বিক্ষোভ। আর ওরা বিক্ষোভ না করেই বা কী করবে?
ছাত্রদের বেশীরভাগই মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। কেউ কেউ টিউশনি করে পড়ার খরচ জোগাড় করে। এখানে কম বেতনে পড়ালেখা,কম খরচে কোচিং করে ওরা। এখন কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে এতো খরচ চালানো তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব নয় আর। যারা ডোনেশন দিতো তারাও ডোনেশনের মাত্রা কমিয়ে দিয়েছে। অনুদানও বন্ধ।এই অবস্থায় ছাত্রদের বেতন বাড়ানো ছাড়া স্কুল কর্তৃপক্ষের করার কিছু নেই।
বেতন বাড়ানোর নোটিশ টাঙানোর সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররা নেমে পড়েছে পথে। যা করা উচিত নয় করছে তাই। দোকান, গাড়ি ভাংচুর আর দিচ্ছে আগুন। পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ছুঁড়ছে। কর্তৃপক্ষ সামাল দিতে পারছে না ছাত্রদের।
নীতা, টেবিলে ব্রেকফাস্ট দিয়ে ডাকে ছেলেকে। ওর ছেলে, বিভাস এখন এমবিএ করছে। কাল রাতে বলেছিল মেকআপ ক্লাস আছে ওর। ওকে ডেকে তুলে দেয়। বিভাসের সঙ্গে খেয়ে নেয়। বিভাস চলে গেলে রেডি হবে।
মোবাইল বাজে। অধ্যক্ষের ফোন। ওকে যেতে না করলো অধ্যক্ষ। অধ্যক্ষ, মানুষটা ভালো। নারী টিচারদের সঙ্গে সম্ভ্রমের সঙ্গে কথা বলে। তাদের সুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রাখে। ছাত্ররা কালকের সমঝোতা মানে নি। ওরা আবার রাস্তায় নেমেছে। পুলিশ লাঠিচার্জ করছে কখনও, কখনও ছিটাচ্ছে আগুন -পানি। ছাত্ররা ইট-পাথর ছুঁড়ছে। নীতা, টেলিভিশন চালু করে। এখন তো অনেক চ্যানেল। একে একে ঘুরাতে থাকে চ্যানেল। এক চ্যানেলে চোখ আটকে যায়। পুলিশ জটলা ভেঙে দিয়েছে। সরে গেছে ছাত্ররা। কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে মাঝে একটি ছেলে পড়ে আছে, রক্তাক্ত। ছেলেটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু প্যান্ট, শার্ট পরিচিত মনে হলো নীতার।
নীতার মনে ওপর একটুখানি ছায়া ভেসে যায়, বিভাস নয় তো! পরক্ষণেই মন থেকে তাড়িয়ে দেয় সব অ-কথা, কু-কথা। বিভাসের ওখানে, ও পথে যাওয়ার কথা নয়। বিভাস! বিভাস পৌঁছে মোবাইল করে নি। ও তো ভুলেই গিয়েছিল ফোন করে নি বিভাস। নীতা রিং করে। ফোন unreachable, এই মুহূর্তে ফোন বন্ধ আছে। ওর ফোন বন্ধ তো থাকার কথা নয়। ওর বুকের ভেতর শূন্য হয়ে যাচ্ছে আবার। চোখ ভেঙে কান্না আসছে।
রিং এর পর রিং করে যায় নীতা। কিন্তু বারবার রোবটিং কণ্ঠের সেই একই কথা শুনলো নীতা। ‘এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়’। কখনও বা ‘আপনি যে নম্বরে ডায়াল করেছেন তা এই মুহূর্তে বন্ধ আছে’। নীতা এ ঘর ও ঘর পায়চারি করতে থাকে। বিভাসের বাবা তো নেই। ওর বাবা একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির জেনারেল ম্যানেজার ছিল। আগুন থেকে ওই ফ্যাক্টরি বাঁচাতে গিয়ে নিজে আগুনে পুড়েছে। ওকে একা রেখে গিয়েছে। ছেলে, বিভাসের তখন পনেরো চলছে। ছেলেকে নিয়ে থাকার কোন অসুবিধা নেই তার। নিজের ফ্ল্যাট। আর চাকরি আছে। মায়ের সুবাদে পাওয়া কিছু সম্পত্তিও আছে।
নীতা আবার ট্রাই করে। কিন্তু কোনো ফল হয় না। বারবার সেই একই কথা। ‘সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়’। ফোন কেন আন-রিচ-অ্যাবল হবে। নেটওয়ার্কের তো কোন প্রব্লেম নেই। যেদিন ভূমিকম্প হয়েছিল সেদিন কিছুটা সময় নেটওয়ার্ক প্রব্লেম ছিল। এখন তো আর তা নেই, তাহলে।
নীতা একবার ওঠে, একবার বসে। একবার পায়চারি করে। একবার বারান্দায় যায়। তাকিয়ে থাকে রাস্তায়। মন মানে না। কী করবে, কোথায়, কার কাছে খোঁজ নিবে বিভাসের। বিভাস, বিভাস ওর বাঁচার একমাত্র আশ্রয়স্থল।
ইন্টারকম বাজছে। শ্লথ হাতে রিসিভার ওঠায়। সিকিউরিটি’র ফোন। নিচে যেতে বলেছে। গতকাল রাত থেকে লিফট খারাপ। এখন পর্যন্ত সারানো হয় নি। ও চাবি দেয় দরোজায়। সিড়ির এপাশের কার্নিশে উড়ে এলো একটা কাক। কিছুক্ষণ বোবা চোখ মেলে দেখলো ওকে। তারপর কণ্ঠ চিরে ডাকতে শুরু করলো, খা খা খা।
#afrozaaditi.com, #আফরোজা অদিতি
