বাস থেকে নেমে দাঁড়ালো বাবু। বাবলি হাসান বাবু। ঝুম বৃষ্টি ছিলো। এখন ঝরছে টিপ টিপ। বাবু আসছে পাবনা থেকে। নেমেছে গাবতলীতে। যাবে শান্তিনগর। বাবু, একটা এন.জি.ও’তে আছে। পাবনায় দুই দিনের ট্রেনিং করাতে গিয়েছিলো। আজ না এলেও চলতো, তবে ওই যে কথায় আছে ‘ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়া’- ওর মনটাও সেই রকম। একটা কথা মনে হলেই হলো- সঙ্গে সঙ্গে সেটা না করলে ওর ভালো লাগে না। মনে হয়েছে ঢাকা আসবে,অনেক কষ্টে টিকিট ম্যানেজ করে বাসে উঠেছে।
আসতে অবশ্য খারাপ লাগেনি। বাসে ওঠার সময় কড়া রোদ ছিলো। কিছুক্ষণ পরেই আকাশের মুখ অন্ধকার। তারপর থেকেই শুরু হয়েছে আকাশের কান্না। আষাঢ়ের আকাশ, এর মতিগতি বুঝা ভার। এই হাসি তো এই কান্না। বাবুর সীটটা ভালো জায়গায় ছিলো না। যেচে পড়ে এক তরুণ তার সঙ্গে সীট বদল করাতে জানালার কাছে বসতে পেরেছে। তরুণের সঙ্গে ছিলো একজন মহিলা। মহিলা ওকে জানালার পাশে দিয়ে নিজে এদিকে বসেছে। বাবু, জনালার কাছে বসতে পেরেছে এই সুখে, মনে মনে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখতে দেখতে এসেছে। বৃষ্টিতে গাছের পাতা সুন্দর ঝকঝকে সবুজ দেখাচ্ছে। পাতার গায়ে কোথাও কোন ধুলিকণা লেগে নেই। এই রকম সবুজ দেখলে চোখ জুড়িয়ে শীতল হয়ে যায়। ঈশ্বরের কী অপূর্ব সৃষ্টি, কী অপার মহিমা। বুক ভরে নিঃশ্বাস আর চোখ ভরে সুন্দরতা নিয়ে বাবু নামলো ঢাকায়।
যতোক্ষণ বাসে ছিলো ততোক্ষণ ভালোই ছিলো। ঢাকায় নেমেই পড়েলো বিপাকে। ঢাকা শহরে বৃষ্টি হলেই সড়ক-মহাসড়ক, ফুটপাত অলি-গলি সব ডুবে যায়। মানুষ চলতে-ফিরতে নাকাল নাজেহাল। বাবুর ছাতা ব্যবহার করতে ভালো লাগে না। ও রেইনকোট ব্যবহার করে। রেইনকোট পরে বৃষ্টিতে হাঁটতে খুব আনন্দ পায় ও। কিন’ এবারে ব্যাগে রেইনকোট ভরতে ভুলে গেছে। অগত্যা টিপটিপ বৃষ্টিতেই বাস থেকে নেমে শুকনা জায়গা দেখে দাঁড়ালো। এখান থেকে বাসায় যেতে একটা সি.এন.জি অথবা ক্যাব প্রয়োজন।
টিপটিপ বৃষ্টি হলেও ভিজে যাচ্ছে, তাই ব্যাগটা হাতে সামনে ফিলিং স্টেশনের দিকে হাঁটতে থাকে। ওখানে অপেক্ষা করবে সি.এন.জি’র জন্য। সি.এন.জি খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত, হতাশ বাবু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিই দেখতে থাকে। শান্তিনগর কেউ যেতে চায় না। একে যানজট তারপরে আবার রাস্তায় পানি। একবার যদি ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যায় তাহলে স্টার্ট বন্ধ হয়ে ঝামেলায় পড়তে হয়। বেশীরভাগ চালকই এই ঝামেলায় যেতে চায় না।
বাবু একমনে দাঁড়িয়ে আছে। এই ক্লান্তিতেও ওর মন চলে যায় চার বছর আগের এক ঝুম বৃষ্টিতে। ও তখন থাকতো মগবাজার ডাক্তার গলিতে। মেইন রোডই ডুবে গিয়েছিলো সেদিন, আর ডাক্তার গলির তো কথাই নেই! হাঁটু পানি। একটু বৃষ্টি হলেই গলিতে রিকশা ঢুকতে চায় না। রিকশার পা-দানী ডুবে যায়, রিকশা টানতে খুব কষ্ট হয়। সি.এন.জি গলির মাথায় এসে নামিয়ে দেয় ওকে। রিকশার জন্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রিকশা না পেয়ে হাঁটতে থাকে। অল্প পথ। হাঁটছিলো একমনে। একহাতে স্যান্ডেল অন্য হাতে ব্যাগ। পানির ভেতর হাঁটতে ভালোই লাগছিলো। হাঁটতে হাঁটতে মনের ভেতর গুণগুণিয়ে উঠেছিলো -“এক বর্ষায় দেখা হলো দু’জনে—”। আচমকা এক রিকশা এসে পাশে থেমেই ওর ব্যাগটা হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেলো। আশেপাশে কেউ নেই। চিৎকার করেও কোন লাভ নেই জেনেই ও আর চিৎকার করেনি। দৌড়ে ধরার মতো অবস্থাও ছিলো না। আচমকা ছিনতাই হওয়াতে কেমন যেন থতমত খেয়ে গিয়েছিলো। কী করবে দিশা পাচ্ছিলো না। ঠাঁই দাঁড়িয়েছিলো আর ততোক্ষণে রিকশা অনেক দূর চলে গিয়েছিলো। সেদিন ব্যাগে টাকা বেশী ছিলো না। ছিলো মোবাইল। মোবাইল সবসময় হাতেই রাখে সেদিন বৃষ্টির জন্য ব্যাগে রেখেছিলো। বাবুর হঠাৎ মনে হলো, আজও কী সে রকম হবে! ও জানে ওর ভাগ্যটা কখনও একটানা সুখে যায় না। আজকের দিনে অনেক ভালো একসঙ্গে ঘটেছে! ও একটু সংস্কারে বিশ্বাস করে। কথায় আছে না- “যত হাসি তত কান্না বলে গেছেন রামসন্না”-। ভালো হলে মন্দ হবেই। আনমনে হাসে বাবু।
পাশে একটা বাস এসে থামে। গ্যাস বা তেল নিতে এসেছে বাসটা। হর্ণ দিচ্ছে ওকে সরে যাওয়ার জন্য। বাসের হর্ণে বাস্তবে ফিরে আসে ও। ওখান থেকে বের হয়ে হাঁটতে থাকে। দাঁড়িয়ে থাকতে আর ভালোও লাগছিলো না। ফুটপাত ধরে হাঁটছে। কিছুদূর এসে- এসে থামছে যদি কোন বাহন পাওয়া যায়। কিন’ কোন বাহনই পাচ্ছে না। কি করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। এর মধ্যে বৃষ্টি জোরেসোরে শুরু হয়েছে আবার। বৃষ্টিতে হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে। বৃষ্টির ছাট কম লাগে এমন জায়গা দেখে দাঁড়ায় বাবু। কিন’ জায়গাটা অন্য জায়গার থেকে কিছুটা নির্জন। সামনে কোন ট্রাফিকও নেই। ও দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ এই বৃষ্টির মধ্যে একটা ক্যাব আসতে দেখে একটু খুশিই হয়। একটু সামনে এগিয়ে আসে। হাত তোলে। ক্যাবটা ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। ক্যাব থেকে নামে দু’জন। একজন নেমে ওর ব্যাগটা নিয়ে ক্যবের ভেতর ঢুকে যায়। ড্রাইভার ব্যাগ নিয়েছে ভেবে, ও ক্যাবে ওঠার জন্য পা বাড়ায়। কিন’ অন্য তরুণ ওর পাশে দাঁড়িয়ে পিস্তল ঠেকিয়ে ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর ব্যাগটা রাস্তায় ফেলে দেয় ভেতর থেকে আর জানালায় হাত বাড়িয়ে কতকগুলো প্যাকেট দেখিয়ে বলে, এগুলো আমাদের। পিস্তল ঠেকানো তরুণ সুড়-ৎ করে ক্যাবের ভেতর ঢুকে গেলে সাঁ করে ক্যাব ওর দৃষ্টির বাইরে চলে গেলো।
ওই প্যাকেটে যে ড্রাগ আছে বিহ্বল বাবুর তা বুঝতে বাঁকি থাকে না! কিন’ ওই প্যাকেটগুলো ওর ব্যাগে এলো কেমন করে, সেটাই বুঝতে চেষ্টা করছে। মনে পড়ে বাসে চেকিংয়ের কথা। বিশ্বস্ত সুত্রে পুলিশ খবর পেয়েছে, বাসে ড্রাগ নিয়ে আসছে কেউ। ওর ব্যাগ ছোট তাই নিচে লাগেজ বক্সে দেয়নি। মাথার উপরে বাঙ্কে রেখেছিলো। চেকিং হওয়ার পর ওর ব্যাগে তো নয়ই, বাসের কারও কাছেই কিছুই পায়নি। কিন’ এখন বুঝতে পারছে কেন পায়নি। এখন বুঝতে পারছে কেন জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলো ওরা। কেন ওই মহিলা চেকিং হওয়ার পর ওর ব্যাগটার চেইন লাগিয়ে দিয়েছিলো। ও নিশ্চিত হয়েছে এখন, ওই চেইন লাগানোর সময় কৌশলে প্যাকেটগুলো চালান করেছিলো ওর ব্যাগে।
ওদিকে চেকিং অফিসার বোধহয় ভেবেছিলো ব্যাগটা ওই মহিলার। না হলে ওর লাগেজ কোথায় জিজ্ঞেস করবে কেন অফিসার। ওর তখন কিছুই মনে হয়নি। ও শুধু আঙুল দিয়ে ব্যাগটা দেখিয়ে দিয়েছিলো। ওর মনে পড়ে মহিলাকে আর চেক করেনি চেকিং অফিসার। চেকিং অফিসার হয়তো ভেবেছে ওরা একসঙ্গে যাচ্ছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবু, নাহ, চলতে- ফিরতে আরও সাবধান হতে হবে ওকে। হতাশ বাবু আরও হতাশ হয়ে ছুড়ে ফেলা ব্যাগটার পাশে বসে বসে ভিজতে থাকে।
পরদিন সকালে পত্রিকা খুলে দেখতে পায়, ওর পাশে বসা সেই মহিলাসহ তিন তরুণের ছবি। নিচে লেখা ইয়াবা সহ এক মহিলা এবং তিন তরুণ গ্রেফতার।
