নস্টালজিয়া // আফরোজা অদিতি

রিফাত একটা ব্যাংকে আছে। কাজ করতে পছন্দ করে। ও নারী বলে যে সব কাজে সুবিধা নিতে হবে এমন ধারণায় বিশ্বাসী নয় ও। ও বিশ্বাস করে নারী ও পুরুষ শুধু প্রকৃতিগত কারণে শারীরিক ভাবে ভিন্ন তাছাড়া অন্য কোন বিষয়ে কোন তফাৎ নেই। একজন পুরুষ যে কাজ পারে, একজন নারীও সে কাজ করতে পারে। নারী ও পুরুষের কাজের কোন ভিন্নতা নেই। এই কাজ পুরুষের আর ওই কাজ নারীর এমন ধারণায় বিশ্বাস করে না রিফাত। একটু আলাদা রকমের রিফাত কখনও পেছনে তাকায় না। পেছনে তাকানো স্বভাব নেই ওর মধ্যে। গন্তব্যের পথে একবার চলা শুরু করলে রাস্তায় সি.এন.জি কিংবা রিকশা যদি নাও পায় আর পেছনে ফেলে আসা রাস্তায় গেলে পাওয়া যাবে জানলেও যায় না সেখানে। যেতে মন চায় না ওর। সামনেই হাঁটতে থাকে।
অতীত নিয়েও ভাবে না কখনও রিফাত। যা চলে যায় জীবন থেকে তাকে আর কখনও ফিরে পেতে চায় না। ভাবেও না। কিন’ আজ কী যে হচ্ছে, শুধু পেছনে যেতে ইচ্ছা করছে ওর। এ কী বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের জন্য, না কী ওর মনটা পরিবর্তিত হচ্ছে ক্রমশঃ। আষাঢ় মাস। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে । আজ ছুটি। ও বারান্দায় রকিং চেয়ারে। বৃষ্টির জল এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে ওর মুখ, ওর পা। ভেজা হাওয়ায় উড়ছে ওর শাড়ির আঁচল। ওর মনে পড়ছে ছোটবেলার একটা কবিতা।
আষাঢ় মাস গরু খায় ঘাস
খাবু তো খা না খাবু তো বাড়িত যা

হা হা হা। হেসে ওঠে রিফাত। সেই কবেকার কথা । ওদের কয়েক বন্ধুর মধ্যে চলছিলো চানাচুর আর মুড়ি মাখিয়ে খাওয়া আর কবিতা বলার খেলা। আনন্দ আর হাসি, কবিতা রাশি রাশি।
বাইরে বৃষ্টির চাদর বিছিয়ে দিয়েছে প্রকৃতি। ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ডাকে শিফাতকে। শিফাত আসে না। বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। এই এক মানুষ, খুব ঘুম কাতুরে হয়েছে আজকাল। ওর যে বৃষ্টি ভালো লাগে না তা নয়। ব্যবসায়ী, শিফাত কাজের চাপে যখনই একটু সময় পায় ঘুমিয়ে নেয়। বলে, এখন কী আর সেই বয়স আছে যে কথায়, গল্পে সময় কাটাবো। জীবনের শক্তি তো মাত্র কয়দিনের, কিছু একটা করে রাখতে না পারলে যখন বয়স হবে তখন চলবে কী করে! আগে এমন ছিলো না। এখন খুবই বৈষয়িক। রিফাতের যে খারাপ লাগে তা নয়, কিন’ আজ মনে হচ্ছে শিফাত না ঘুমিয়ে ওর পাশে থাকলে খুব ভালো লাগতো।

শিফাত না এলেও রিফাত ওঠে না। একমনে বৃষ্টি দেখতে থাকে। ওর মনে পড়ে কয়েকদিন আগে ফেসবুকে লেখা একটা কবিতা। কবি সাযযাদ কাদিরের কবিতা- ‘ মণিমালা, তোমার বর্ষা এলো আজ এই শহরে। কখনও শনশনে হাওয়ায়/ হাওয়ায় নামে ফিনফিনে বৃষ্টি কখনও টিপটিপ সারাদিন, কখনও ইলশে গুড়ি।’- কবিতাটা ভালো লেগেছে ওর। কবিতার লাইন দুটি কয়েকবার আবৃত্তি করে।

আবার শিফাতকে ডাকে। আজ শিফাতকে শোনাতে ইচ্ছা করছে ছোটবেলার সেই আমকুড়ানোর দুরন্তবেলার কথা। ঝড়, বৃষ্টি একসঙ্গে। হাওয়ার দাপটে ফজলি আম গাছের তলায় বিছিয়ে যেতো, কুড়িয়ে শেষ করা যেতো না। শোনাতে ইচ্ছা করছে বান্ধবীদের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজার কথা। বৃষ্টিতে ভিজে নেচে নেচে সুর করে বলা ছোটবেলার সেই ছড়া- কচুর পাতা করমচা/ এই বৃষ্টি তুই চলে যা। তারপর বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর এলে মায়ের সেই স্নেহের বকুনির কথা আজ শিফাতকে বলতে ইচ্ছা করছে।

বৃষ্টি না এলে, পাড়ার বউ- মেয়েরা মিলে ঘর-ঘর থেকে কুলায় করে চা’ল, ডা’ল, মরিচ, মসলা লবণ সংগ্রহ করা, খিচুড়ি খাওয়া। কাপড়-চোপড়ে কাদা মাখামাখি মেঘকে ডাকা -‘দেওয়া নামে ইন্দু বিন্দু/ উঠান ভরা পানিতে/ দেওয়ারে তুমি অধরে অধরে
নামো—।’ কালা মেঘা ভাই, ধলা মেঘা ভাই জলদি জলদি নামো- মেঘ নামানোর সেইসব মেয়েলি গীত আজ শোনাতে ইচ্ছা করছে শিফাতকে। শিফাত, এই শিফাত। বার কয়েক শিফাতকে ডাকার পরেও সাড়া মিললো না শিফাতের। অভিমান দানা বেঁধে উঠলো বুকের ভেতর। কিশোরবেলার মতো ঠোঁট ফুলিয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ।

আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে রিফাত। সুরমা রঙের আকাশ। বৃষ্টির চাদরে ঢাকা প্রকৃতি। রাস্তায় থৈ থৈ পানি। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যাওয়ার কারণে স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেছে গাড়ির। গাড়িতে এক তরুণী। বয়স ২০ প্লাস হবে।

রিফাত চলে যায় ওর ২০ বছর বয়সে। আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট থেকে ফিরছিলো। হিন্দী কোর্সের প্রথম ক্লাস ছিলো সেদিন। ক্লাস চলার সময় থেকেই নেমেছিলো বৃষ্টি। অঝোর ধারার বৃষ্টি। ক্লাস শেষ হলে বৃষ্টির ভেতরেই নেমেছিলো রাস্তায়। বৃষ্টিতে ভিজতে সবসময়ই ভালো লাগে ওর। আশেপাশে কেউ ছিলো না। ও আবৃত্তি করছিলো রবীন্দ্রনাথের বর্ষার কবিতা- ‘ ঝরঝর ধারে ভিজিবে নিচোল, ঘাটে যেতে পথ হয়েছে পিছল, ওই বেণুবন দুলে ঘনঘন পথপাশে দেখ্‌ চাহিরে। ওগো আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে-’। কবিতার লাইন শেষ হতেই হাততালির সঙ্গে কথা- তুমি তো বের হয়েছো । চমকে ওঠে রিফাত। বৃষ্টির জন্য চেহারা অস্পষ্ট। চেনা যাচ্ছে না। শুধু বুঝা যাচ্ছে একটা মানুষ, ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। হাতে তার ডাটাশুদ্ধ কদমফুল। আবছা অবয়ব সামনে আসে, বলে, আমার নাম শিফাত। বর্ষার প্রথম কদম, নেবে?

মনের কথা প্রাণের কথা নিবেদনের আশ্চর্য পন’া ওকে বিস্মিত করে। ও হাত বাড়িয়ে কদমফুল নেয়। তারপর পায়ে পায়ে হাঁটে একসঙ্গে। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যায় একটা ঘরে। সে ঘর এখন দুজনের।
কিন্তু সেই শিফাত! অভিমান ভুলে আবার ডাকতে যায় শিফাতকে। কিন্তু মুখ খোলার আগেই একটা প্রেমময় হাতের স্পর্শ পায় ওর কাঁধে। পেছন ফিরে না তাকিয়েই শিফাতের হাতের ওপর হাত রাখে রিফাত।

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615