আফরোজা অদিতির ‘জ জীবন’ : তীব্র ভাষ্যের দলিল যে উপন্যাস

কবি ও কথাসাহিত্যিক আফরোজা অদিতি বেশ কয়টি উপন্যাস লিখেছেন। বিষয়বস্তু ও ভাবনার বিস্তারে সেগুলোর প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্র সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু একথা না বলে উপায় নেই যে, তাঁর অন্য সব উপন্যাসকে ছাপিয়ে ‘জ জীবন’ উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে উজ্জ্বল ও অনন্য। এই উপন্যাসে তাঁর লেখক সত্ত্বা যেন এক সংগ্রামী নারীর মধ্যে নিজেকে দ্বিধাহীনভাবে মেলে ধরেছেন – অভিজ্ঞতা ও কল্পনার সংমিশ্রনে এটি হয়ে উঠেছে একজন নারীর জীবন ও সংগ্রামের অতি বাস্তব চিত্র যেখানে ইতিহাসের অনেকগুলো অধ্যায় প্রতিফলিত হয়েছে সত্যনিষ্ঠ আয়নায়।

লেখক আফরোজা অদিতি তাঁর এই উপন্যাসে একজন নারীর গল্পই বলতে চেয়েছেন। যে নারী তার যৌবনের শুরুতে পেয়েছে এক যুদ্ধমুখর বাংলাদেশকে। এবং পারিবারিকভাবে সে বড়ো হয়েছে এমন এক পরিবেশে যেখানে রাজনৈতিক দ্বন্দ, সংগ্রাম ও ঘাত-প্রতিঘাতে ছিল নিত্যসঙ্গি। ফলে লেখকের ইচ্ছা অনুযায়ী যদিও এটি রোমান্টিক ধরণের উপন্যাস হয়ে উঠতে ধরেছে, কিন্তু পটভূমি ও সামগ্রিক বাস্তবতা এটিকে তৈরি করেছে অনেকটাই কঠোর ধাঁচের ও রাজনৈতিক উপন্যাসের আদলে এক তীক্ষ্ণ ভাষ্যের দলিল।

ইতিহাসের অনেক কিছুই বর্তমানের স্রোতে গা ভাসিয়ে ভুলে যেতে পারে মানুষ কিন’ যখন কেউ শিকড়ের সন্ধানে নামে, তুলে ধরতে চায় প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির সমীকরণ তখন অনেক কিছুই নতুন করে মনে পড়ে, মনে পড়তে বাধ্য হয়। ‘জ জীবন’ উপন্যাসে ইতিহাসকে স্মরণ করারই প্রবণতা প্রধান হয়ে উঠেছে। এই উপন্যাসের নায়িকা কখনই এড়াতে পারেনি অল্প সময়ে ঘটে যাওয়া কঠিনতম ঘটনাবলিকে। তার জন্য স্বদেশ যেন হয়ে উঠেছিল রুদ্র স্মৃতির প্রতীক। ঘরে এবং বাইরে সেই রুদ্রতাকে লেখক অনেক সময়ই রাখ-ঢাক না করে বর্ণনা করেছেন, বর্ণনার এই ভাষা রোমান্টিকতার চাদরে চাইলেও ঢাকা যেত না।

‘জ জীবন’ উপন্যাসটি খুব বড় আয়তনের নয়। বইয়ের পৃষ্ঠায় মাত্র ঊনআশি পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ। তবে নিরেট গাঁথুনির কারণে এটি অনেক বেশি কাহিনীকে নিজের শরীরে ধরে রাখতে পেরেছে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সুমি। তাকে ঘিরেই দোলায়িত হয়েছে সব কিছু। কিন’ সে পারিপার্শ্বিকের ওপর প্রভাব বিস্তারী নয় বরং সহজেই শিকারে পরিণত হয়েছে পারিপার্শ্বিকতার। অন্য প্রধান চরিত্র হচ্ছে সুমির স্বামী, অনীশ। কিন্তু উপন্যাসে খুব বেশি সময় তার উপস্থিতি নেই। মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে সে নিহত হয়। কিন’ তার না থাকাও সুমির জন্য কম প্রভাববিস্তারী নয়। কারণ তাদের দুজনের শিশু সন্তান স্বাধীনতা। স্বাধীনতাকে বড় করে তোলার মধ্যেই সুমি তার জীবনের আরাধ্য খুঁজে পায়। এই প্রধান চরিত্রের অতিরিক্তি আরও অনেক চরিত্র রয়েছে- সব মিলে কহিনীর গতিশীলতা অত্যধিক। এর বাইরে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের উপসি’তি। সমস্ত চরিত্র, ঘটনাবলি নানা সময়ে নানা ভাবে একজন সাধারণ নারীর জীবনকে দোলায়িত করেছে, সেই নারী সংগ্রামের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছে, যুদ্ধের বিভিষীকায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়েছে, মানবেতর জীবন যাপন করেছে আবার ঘুরেও দাঁড়িয়েছে। এক সাধারণ মেয়ের কাহিনী এভাবেই অসাধারণ হয়ে উঠেছে ‘জ জীবন’ উপন্যাসে।

এই উপন্যাসে কাহিনী বর্ণনার ক্ষেত্রে সুমিই একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু। অর্থাৎ যেখানে সে আছে সেখানে বর্ণনাও চালু আছে। কিন’ এরই ফাঁকে ফাঁকে বেশ কিছু চমৎকার দৃশ্য আঁকার কাজ করেছেন ঔপন্যাসিক। সেসব দৃশ্যে তৈলচিত্রের মতো ফুটে উঠেছে সে সময়কার অনেক ঘটনার চিত্র। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কিছু চিত্র, একাত্তরে পাকিস্তানী সেনাদের হামলায় গ্রামের সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের চিত্র কিংবা অনেকগুলো রোমাণ্টিক আবহের চিত্র দেখা যায় এই উপন্যাসে, সেখানে বর্ণনা-ভঙ্গির গুণে সবকিছু জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তবে এই উপন্যাসে একটি দূর্বলতা লক্ষ্য করা যায়, তা হলো প্রধান দুই চরিত্র ছাড়া অন্যান্য চরিত্রগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী বিস্তার লাভ করেনি। অনেক পার্শ্বচরিত্র সামান্য বর্ণনার মধ্যে শেষ করা হয়েছে- এগুলোকে বেড়ে উঠতে দিলে কাহিনী ডালপালা ছড়িয়ে আরও বেশি চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠতে পারতো। তবে কিছু পার্শ্ব চরিত্রের আদ্যোপান্ত পাঠক বুঝে নিতে পারবে- কিন্তু তাদের উপস্থিতি ও সমস্যাবলিকে নিতান্ত প্রয়োজন অনুযায়ীই পাওয়া যাবে, তাদের মনোজগতের হদিস ভোবে পাওয়া যাবে না। হয়তো দ্রুতই শেষ করার তাড়নাতে কোথাও কোথাও সংক্ষিপ্ত আকার প্রকট হয়েছে, কিন্তু প্রধান চরিত্র সান্ত্বনা রায়হান সুমির পরিপূর্ণ অবয়ব এর পরিস্ফূটন সব দূর্বলতাকে ঢেকে দিয়েছে আর এক মানবিক হাসি-কান্নায় উজ্জ্বল হয়েছে ‘জ জীবন’ উপন্যাসের পুরোটা শরীর। ‘জ জীবন’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯ সালে। প্রকাশ করেছে সুচিত্রিত।

(আলোচনায় : ইয়াসির আজিজ)

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615